এবার বাংলাদেশ ছাড়তে চায় পসকো দাইয়ু
অস্ট্রেলীয় কোম্পানি সান্তোসের পর এবার বাংলাদেশ ছাড়তে চায় কোরীয় কোম্পানি পসকো দাইয়ু। ৬ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে দুই বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে সমুদ্রভাগে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে দীর্ঘকালের অচলাবস্থা ভেঙে সরকার যে নতুন শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল তা হোঁচট খাবে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
জ্বালানি ও
খনিজ সম্পদ বিভাগ সূত্র জানায়, দেশের অগভীর সমুদ্রে ১১ নম্বর ব্লকে
দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ পরিচালনাকারী সান্তোস গত জুনে
বাংলাদেশে আর কাজ না করার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল। এবার চলতি নভেম্বরের ১৩
তারিখে কোরীয় কোম্পানি পসকো ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশন বাংলাদেশ ছাড়ার
পরিকল্পনা জানিয়ে পেট্রোবাংলাকে চিঠি দিয়েছে। এটি বঙ্গোপসাগরের গভীরে ১২
নম্বর ব্লকে জরিপ কাজ পরিচালনা করছে।
২০১৬ সালের
ডিসেম্বরে বঙ্গোপসাগরের ঐ ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পসকো দাইয়ুর সঙ্গে
উত্পাদন-অংশীদারিত্ব চুক্তি (পিএসসি) সই করে পেট্রোবাংলা। ‘বিদ্যুত্,
জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন-২০১০’ (বিশেষ বিধান)-এর আওতায় ব্লকটি
দাইয়ুকে ইজারা দেওয়া হয়। এরপর তারা দ্বিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ শুরু করে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ৩ হাজার ৫৬০ লাইন কিলোমিটার জরিপশেষে বহুজাতিক
কোম্পানিটি জানায়, গভীর সমুদ্রের ১২ নম্বর ব্লকে বিপুল পরিমাণ তেল-গ্যাস
মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাবনাময় পাঁচটি লিড বা প্রসপেক্ট পাওয়া
গেছে। এর মধ্যে তিনটি নিয়ে বেশি আশাবাদী জ্বালানি বিভাগ। সমুদ্র উপকূল থেকে
ব্লকটির দূরত্ব ১৮০ কিলোমিটার, অর্থাত্ এটি বঙ্গোপসাগরের ১৮০ কিলোমিটার
গভীরে। ব্লকটির ওপর পানির গভীরতা গড়ে ১ হাজার ৭০০ মিটার। এরপর গ্যাসের
সম্ভাবনা নিশ্চিত হতে ২ হাজার লাইন কিলোমিটার জুড়ে ত্রিমাত্রিক ভূকম্প জরিপ
করার কথা পসকো দাইয়ুর। এ সম্ভাবনার মধ্যে ত্রিমাত্রিক জরিপ কাজ শুরু না
করে তারা তাদের সঙ্গে বিনিয়োগ অংশীদার খুঁজতে শুরু করে। এর পাশাপাশি তারা
পিএসসির বাইরে গিয়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশকে। সে
প্রস্তাবে পেট্রোবাংলা রাজি হয়নি। এরপর তারা জানায়, গ্যাসের মূল্য না
বাড়ালে কোম্পানিটি বাংলাদেশ অপারেশন অব্যাহত রাখতে পারবে না। গ্যাসের মূল্য
না বাড়ালে গ্যাসের ভাগ বা মুনাফার ভাগ বাড়াতে হবে। তাহলে তারা ব্যবসা
অব্যাহত রাখতে পারবে। সেক্ষেত্রে কোম্পানিটি আরো এক বছর চুক্তির মেয়াদ
বাড়াতে চায়।
মিয়ানমারের
সমুদ্র ব্লক এডি-৭’র থালিন ১-এ গ্যাসক্ষেত্রের পাশেই বাংলাদেশের ডিএস-১২
নম্বর ব্লকটি অবস্থিত। ঐ গ্যাসক্ষেত্রেও গ্যাস পেয়েছে দাইয়ু। এখন গ্যাস
উত্তোলনও করছে তারা। বাংলাদেশের ডিএস-১২ ও মিয়ানমারের ব্লক এডি-৭ একই
ভূতাত্ত্বিক কাঠামোতে অবস্থিত। ফলে সেখানেও গ্যাস পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা
আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পেট্রোবাংলার
একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সমুদ্রভাগে গ্যাস-খনিজ পাওয়ার
বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। আমরা গুছিয়ে উঠতে পারছি না বলে ফলাফল আসছে না। পসকো
দাইয়ু প্রতিশ্রুত পরিমাণের প্রায় দ্বিগুণ এলাকায় দ্বিমাত্রিক জরিপের পর
উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে
তারা গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর বিষয়ে বলতে শুরু করে। পেট্রোবাংলা ঐ সময়
জানিয়েছিল, পিএসসির বাইরে গিয়ে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন,
পিএসসি-২০০৮ সংশোধন করে গ্যাসের মূল্য বাড়িয়েই পসকোর সঙ্গে উত্পাদন
অংশীদারিত্ব (পিএসসি) চুক্তি করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরে জরিপ পরিচালনায়
নিয়োজিত ভারতীয় কোম্পানি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশনের
(ওএনজিসি) সঙ্গেও একই ধরনের চুক্তি হয়েছে। ফলে তাদের যদি পিএসসির বাইরে
গিয়ে সুবিধা দিতে হয়, তাহলে ওএনজিসিসহ নতুন যেসব কোম্পানি আগ্রহ দেখাচ্ছে,
তারাও এ সুবিধা চাইবে। এটি সরকারের দরকষাকষির সুযোগও কমিয়ে দেবে।
ঐ কর্মকর্তা
আরো জানান, দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপের বাইরে একটি অনুসন্ধান কূপ
খননের কথা রয়েছে পসকো দাইয়ুর। এ জন্য তারা অংশীদার খুঁজছে। এখন পর্যন্ত
ইতিবাচক সাড়া পায়নি। বাংলাদেশে অপারেশন অব্যাহত রাখতে না চাওয়ার এটি একটি
কারণ হতে পারে।
উল্লেখ্য,
২০০৮ সালে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস বঙ্গোপসাগরের ১০ ও ১১ নম্বর ব্লকে
তেল গ্যাস অনুসন্ধানে চুক্তিবদ্ধ হয়। তারাও দ্বিমাত্রিক জরিপে ভালো ফল
পাওয়ার পর গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বাংলাদেশ সেই
প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ২০১৫ সালে তারা চলে যায়। এরপর পিএসসি সংশোধন করে
গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এখন সেই বর্ধিত দামেও রাজি হচ্ছে না পসকো।


No comments